নববর্ষ
আজ পয়লা বৈশাখ।
দশ বছরের রুনু দাঁড়িয়ে আছে ফুটবল খেলার মাঠের লাগোয়া আম গাছের গুঁড়িটা ধরে। ওর মন খারাপ। বুকের ভেতরে কুলকুল করে চোখের জল মেশানো বাষ্পটা দৌড়ে বেড়াচ্ছে খালি মাঠে ফুটবলটার মতন।
রুনুর পাশের বাড়ির মেয়েটা খুব খুশি, সে আজ এক্কেবারে নতুন জামাপাপড় পরে বাবার হাত ধরে হালখাতা করতে যাবে; বাজারের চারটে দোকান থেকে রুনুর বাবার নামেও কার্ড এসেছে, হালখাতার নিমন্ত্রণ। কিন্তু তাতে তার খুব একটা আনন্দ হয়নি, সে তো সন্ধ্যেবেলায়! অনেক দেরি। তার পয়লা বৈশাখের রোমাঞ্চ জাগে সকালবেলায়; পাড়ার এই ফুটবল খেলার মাঠে।
সব বয়সের ছেলেরা আজ জমা হয়েছে এখানে। সবার পরনে নতুন জার্সি, শর্ট-প্যান্ট। চকচকে, রঙিন। অনেকে আবার চকরাবকরা দেওয়া হোরস পরেছে! সঙ্গে স্পাইক লাগানো বুট জুতো। যদিও সবার সামর্থ্য নেই সেরকম। রুনুর তো নেইই। এমনকি তার শর্ট প্যান্ট আর জার্সিটাও পুরোনো। পাঁচ ছ মাস হয়ে গেল। গতবারও বাবা বলেছিলেন, কিন্তু সেই খেলার নতুন পোষাক এবারেও হল না! সবার মাঝে একমাত্র সে-ই পুরোনো ড্রেস পরে ফুটবল খেলবে। পয়লা বৈশাখের মতন সাহিত করার দিনেও!
এবারে নববর্ষে চৈতিপিসি রুনুকে একটা নতুন জামা দিয়েছে। রুনুর মনে মনে ভীষণ ইচ্ছে ছিল, চৈতিপিসিকে জামার বদলে এক সেট জারসি-প্যান্ট কিনে দিতে বলে। কিন্তু মায়ের ভয়ে সে আর বলে উঠতে পারে নি।
কষ্ট হবে না তো কী!
পাড়ার ক্লাব ঘরটার উদ্বোধন হবে আজ। একটু পরেই। খেলার মাঠের পাশে ছোট্ট একটা জায়গায় বাঁশছালের বেড়া দিয়ে নতুন ক্লাবঘর তৈরি হয়েছে; মাথার ছাদ টালি দিয়ে ঢাকা। এই পাড়ার সুব্রতজেঠু থাকেন কলকাতায়। মস্ত বড় বাড়ি তাঁর। এবারের পয়লা বৈশাখে তাঁর হাতে ক্লাবঘরের উদ্বোধন হবে। শুধু তাইই নয়, সুব্রতজেঠু কথা দিয়েছেন, একটা ক্যারম বোর্ডও তিনি কিনে দেবেন আমাদের জন্য! তাতে রুনুর কী লাভ? রুনুতো খেলতে পারবে না! পাড়ার দাদারাই সবসময় ভিড় করে থাকবে সেই বোর্ডের চারপাশে।
একজোড়া ফুটবল খেলার নতুন ড্রেস যদি পাওয়া যেত...!
সে যাই হোক, ঠিক হল ফটবল খেলা শুরু হওয়ার আগেই উদ্বোধন করা হবে ক্লাবঘরের। তারপর মিষ্টির প্যাকেট সবার হাতে দিয়ে ফুটবল খেলা শুরু। সবারই নতুন জামা আছে, শুধু রুনুর নেই আজ। তার দু’চোখের কোন চিকচিক করে উঠল, কেউ দেখে না ফ্যালে!
হঠাৎ করে সুব্রতজেঠু ডাকলেন, ‘রুনু, এদিকে আয়।’
রুনু ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ক্লাবঘরের দিকে। সেখানে সবার ভিড়।
সুব্রতজেঠু সব্বাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘আজ এই ক্লাবঘরের উদ্ঘাটনে আমি আসতে পেরে নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করছি। আজ আমি সত্যিই গর্বিত। সবাই চাইছে দরজার উপর লাগানো ফিতেটা কেটে আমি এই ক্লাব শুরু করি। কিন্তু আমার ইচ্ছে এই ক্লাবের সবচেয়ে ছোট ছেলেটি ফিতে কাটুক; নতুন প্রজন্মকে দিয়ে শুরু হোক আমাদের যাত্রা। আজ আমার হয়ে সেই কাজটি করবে আমাদের ছোট্ট রুনু।’
রুনু তো হতভম্ব! এ আবার কী কথা রে বাবা! চারিদিকে ভিড়। সেই ভিড়ে সাধনদা, হরিদা, বকুলদা, শান্তাকাকু, ভ্যাবলাদা,বাবলুদা—সবাই থাকতে রুনু কেন? হরিদাতো এবছরে স্কুল টিমের হয়ে খেলেছে। টাট্টু ক্যাপ্টেন ছিল, সেও রয়েছে এখানে!
দুরু দুরু বক্ষে সে এগিয়ে গেল সামনে। তার দুঃখ টুক্ষ সব উড়ে গেছে হাওয়ায়। এখন গর্ব হচ্ছে নিজের উপর। সুব্রতজেঠু তার দিকে ছোট কাঁচিটা এগিয়ে দিলেন। রুনু সন্তর্পণে সেটা দিয়ে ক্লাবের দরজার গায়ে বাঁধা লাল ফিতেটা কাটার জন্য এগিয়ে যেতেই সমস্বরে সবাই চেঁচিয়ে উঠল, ‘থ্রি চিয়ার্স ফর ‘আমরা সবাই’’!...
আজ পয়লা বৈশাখ।

No comments:
Post a Comment